বার্নসে পোড়া পোড়া গন্ধ…

টেস্টে তো বটেই, যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেটেই রানআউট সম্ভবত ব্যাটসম্যানদের সবচেয়ে অপছন্দের আউট। কেউই এভাবে আউট হতে চান না।

বোল্ড, ক্যাচ, এলবিডব্লুতে তবু বোলারের কিছু না কিছু ভূমিকা থাকে; কিন্তু রানআউটের দায় তো পুরোটাই ব্যাটসম্যানের। সেটা যদি হয় টেস্টে এবং ওপেনার হিসেবে, তা-ও ব্যাটিংয়ে নামার দ্বিতীয় ওভারের মধ্যে ০ রানে; তাহলে সেই ব্যাটসম্যানের জন্য সমবেদনা।

ররি বার্নসের হয়তো এমন সমবেদনাই প্রয়োজন। অবশ্য ইংলিশ ওপেনারের তাতে শিক্ষা হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়। চলতি অ্যাশেজে পুরো পরিস্থিতি আগে বর্ণনা করে নেওয়া যাক।

প্রথম তিন টেস্ট জিতে পাঁচ টেস্টের সিরিজটা আগেই নিজেদের করে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ টেস্ট হয়েছে ড্র। এবারের অ্যাশেজে ইংল্যান্ড কিছু জিততে চাইলে চলতি হোবার্ট টেস্টই শেষ সুযোগ।

অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ৩০৩ রানে অলআউট হওয়ায় সে সুযোগ আছে ইংল্যান্ডের। কিন্তু বার্নস শুরুতেই যেভাবে সে আশা পোড়ালেন, তাতে ইংলিশ সমর্থকদের বুক ভারী হতে পারে। কে জানে, হয়তো বিরক্তিও জমেছে কিছুটা। ওই আউটের পর ইংল্যান্ড যে প্রথম ইনিংসেও ধুঁকছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইংল্যান্ডের স্কোর ৬ উইকেটে ১৪৫।

হোবার্ট টেস্টে আজ দ্বিতীয় দিনে নিজেদের প্রথম ইনিংসে দ্বিতীয় ওভারের চতুর্থ বলে ব্যাট করছিলেন জ্যাক ক্রলি। প্যাট কামিন্সের বল কাভারে ঠেলে দিয়ে অসম্ভব এক রানের জন্য তিনি দৌড় শুরু করলে সাড়া দেন বার্নস। রান আর হয়নি।

মারনাস লাবুশেনের সরাসরি থ্রোয়ে রানআউট হন বার্নস। ইংল্যান্ড তৃতীয় আম্পায়ারের দ্বারস্থ হওয়ার পর ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, বার্নস ডাইভ দিলে এ যাত্রায় বেঁচে যেতেন। বিপদ বুঝে উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে ভুলেই গিয়েছিলেন ইংলিশ ওপেনার। তাহলে অন্তত রানের খাতা খোলার সুযোগটা থাকত।

অবশ্য বার্নসের জন্য অদ্ভুত সব আউট নতুন কিছু নয়। সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেও তাঁর ব্যাটিংয়ের অদ্ভুত ধরন নিয়ে এমনিতেই ফিসফাস আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে। আর সময়টাও তো ভালো যাচ্ছে না।

০, ১৩, ৪, ৩৪, ০—এই অ্যাশেজে তিন টেস্ট খেলা ররি বার্নসের স্কোর। হোবার্ট টেস্টে এখনো এক ইনিংস বাকি ইংল্যান্ডের। বার্নস এভাবে আবারও ইংল্যান্ডকে না পোড়ালেই হয়!

কিন্তু নিকট অতীত বলছে, বার্নসের ভুলে ইংল্যান্ডের আবারও জ্বলেপুড়ে খাক হওয়ার সম্ভাবনাটা একদম ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রমাণ দিচ্ছে পরিসংখ্যান—টেস্টে আজকের আগে ইংল্যান্ডের কোন ওপেনার সর্বশেষ রানআউট হয়েছেন? উত্তর—ররি বার্নস। তার আগে কে? এবারও উত্তর—ররি বার্নস।

খোলাসা করে বলা যাক। আজকের আগে টেস্টে কোনো ইংলিশ ওপেনারের রানআউট হওয়ার সর্বশেষ নজির ২০১৯ হ্যামিল্টন টেস্টে। সেবার অবশ্য ১০১ রানের ইনিংস খেলে রানআউট হন বার্নস। তার আগে ২০১৮ গল টেস্টে ২৩ রান করে রানআউট হন বাঁহাতি এই ইংলিশ ওপেনার। তাই বার্নসের আবারও রানআউট হওয়ার সম্ভাবনা একদম উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ছেলেদের টেস্টে আজ ২৪তম ওপেনার হিসেবে রানের খাতা খোলার আগেই রানআউট হলেন বার্নস। ইংল্যান্ডের হয়ে এভাবে আউট হওয়া চতুর্থ ওপেনার তিনি। টেস্টে এমনিতেই কেউ রানআউট হতে চান না, তার ওপর ওপেনার হিসেবে রানের খাতা খোলার আগেই ওভাবে আউট হওয়া কতটা বিরল, তা এই পরিসংখ্যানেই বোঝা যায়।

ইংল্যান্ডের জন্য তো আরও বিরল। ইংল্যান্ডের চতুর্থ টেস্ট ওপেনার হিসেবে ০ রানে রানআউট হলেন বার্নস। এই চার ওপেনারের এভাবে আউট হওয়ার মাঝে সময়ের বিশাল ব্যবধানও বলে দেয়, ইংলিশদের বেশ অপছন্দের কাজটাই করেছেন বার্নস।

শুধু ইংল্যান্ড কেন, কোনো দলের ওপেনারই টেস্টে ০ রানে রানআউট হতে চাইবেন না। ২০০৪ থেকে এই দেড় যুগে এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র পাঁচবার। ২০০০ সাল থেকে ধরলে আটবার। ইংল্যান্ড দলের প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

ররি বার্নস আজ রানআউট হওয়ার আগে টেস্টে ইংল্যান্ডের কোনো ওপেনারের শূন্য রানে রানআউট হওয়ার সর্বশেষ নজির ১৯৮৬ পোর্ট অব স্পেনে। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে রানআউট হন উইলফ স্ল্যাক। এ দুটি ঘটনার মাঝে ব্যবধান ৩৬ বছর। স্ল্যাকের ২০ বছর আগে (১৯৬৬) ম্যানচেস্টারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই ০ রানে রানআউট হন ইংলিশ ওপেনার কলিন মিলবার্ন।

আর প্রথম ইংলিশ ওপেনার হিসেবে রানের খাতা খোলার আগেই রানআউট হওয়ার অমোচনীয় কষ্টটা পেয়েছেন অ্যান্ড্রু স্টোডডার্ট। ১৮৯৩ ম্যানচেস্টার টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে এভাবে আউট হন স্টোডডার্ট।

অর্থাৎ স্টোডডার্ট ওভাবে আউট হওয়ার ৭৩ বছর পর মিলবার্ন, এর ২০ বছর পর স্ল্যাক এবং তাঁর ৩৬ বছর পর বার্নস—ইংলিশ ওপেনারদের জন্য এমন আউট বিরলই বটে! তবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং মনে করেন, বার্নস একটু চেষ্টা করলেই বেঁচে যেতে পারতেন, ‘ররি বার্নসকে আরও মরিয়া হতে হতো।

সে দলে ফিরে টেস্ট ক্যারিয়ার বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজের উইকেটটি বাঁচাতে ডাইভ দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার মধ্যে দেখা যায়নি। হ্যাঁ, ভুলটা তার নয়, (রান নিতে) ডাকও সে দেয়নি। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে মারনাস লাবুশেনকে ভেবে দেখুন। সে অন্তত ক্রিজের দু-তিন গজ দূর থেকে ডাইভ দিত।’

কিন্তু নিজেকে বাঁচানোর ইচ্ছা যার নেই, তাঁকে বাঁচাবে কে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *